পাঁচ ইউনিয়ন ও এক পৌরসভা বিশিষ্ট ছোট্ট উপজেলা কালাই। রাজা কানাইলালের কানাই থেকে আজকের কালাই। এক সময়ের বৃহত্তর বগুড়ার মহকুমা শহর থেকে আশির দশকে জেলা ঘোষিত জয়পুরহাটের অন‍্যতম এই উপজেলা প্রাচীনকাল থেকে কৃষি, শিল্প-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্যে ভরপুর। বলিগ্রাম জমিদার বাড়ি, বিলুপ্ত গয়াকুন্ড ধাপ, রাজা নন্দলালের নান্দাইল দীঘি প্রাচীন ঐতিহ্যের নীরব স্বাক্ষী।
ঐতিহ্যের সঙ্গে সংস্কৃতিতেও গৌরবময় ইতিহাস ছোট্ট এই উপজেলার।

একসময় যাত্রাগান, জারিগান, পালাগান, কিসসার আসরের দোতারা, সেতার, সারিন্দার সুরে মুখরিত থাকতো এই জনপদ।
ঐতিহ্যের পথ ধরেই দেশীয় সংস্কৃতিতে এখনো সগৌরবে বিচরণ এই কালাইয়েরই সন্তান একুশে পদকপ্রাপ্ত সাড়া জাগানো নন্দিত কন্ঠশিল্পী মো. খুরশীদ আলমের। ‘বন্দীপাখির মতো’সহ অসংখ্য গানের বরেণ‍্য গীতিকার ঢাকা ডেন্টাল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ‍্যক্ষ আবু হায়দার সাজেদুর রহমান কিংবা ‘দুদিনের এক ভিসা দিয়া’ গানের গীতিকার শামসুদ্দিন হীরা, লেখক, সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক মশিউল আলমের মতো বহু নন্দিত মানুষের জন্ম এই ছোট্ট জনপদে।

শুধু কী সংস্কৃতিতেই জয়গান! রাজনীতিতেও কালাইয়ের গর্ব করার মতো ইতিহাস রয়েছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিপুরুষ আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে নির্বাসিত বিপ্লবী ডাক্তারদা আবদুল কাদের চৌধুরী, পাকিস্তানের সাবেক কৃষিমন্ত্রী কাজী মোখলেছার রহমান, রাকসুর সাবেক প্রো-ভিপি কাদের সরকারের মতো বিখ্যাত মানুষের জন্ম এই কালাইয়ের মাটিতে।

শুধু ইতিহাস ঐতিহ্যে নয়, কৃষিতেও সুনাম আছে এই উপজেলার।
১৪ হাজার হেক্টর আবাদি জমি জুড়ে এক সময় এখানে শোভা পেতো আমন-আউশ, গম খেত। এখন আমন-বোরোর সঙ্গে আলু চাষে সুনাম রয়েছে এই জনপদের।

ইতিহাস ঐতিহ্যে ভরপুর এই উপজেলার গৌরবময় অধ‍্যায়ে ২০১১ সালে একটি কলঙ্ক রচিত হয় । এই কলঙ্কের নাম কিডনি কেনাবেচা। কয়েক শ মানুষের অঙ্গ বিক্রির এই কলঙ্কজনক ইতিহাস উম্মোচনের মাধ্যমে এই জনপদের সহজ সরল মানুষের মুখে চুনকালি মেখে দেওয়ার নেপথ্যে দায়ী ছিলাম কিছুটা আমি নিজেই। কিডনি কেনাবেচার খবর শিরোনাম হয়েছিল বিশ্বের প্রভাবশালী সব গণমাধ্যমে। ইতিহাস-ঐতিহ্যে ভরপুর একটি শান্ত জনপদ রাতারাতি কুখ্যাত বনে গিয়েছিল ‘কিডনি কালাই’ নামে।

কলঙ্কের সেই দাগ মুছে না যেতেই সেই ‘কিডনি কালাই’ এখন আবার শিরোনাম হতে যাচ্ছে ‘করোনা কালাই’ নামে। গোটা জয়পুরহাট জেলা জুড়ে যেখানে করোনা রোগীর সংখ‍্যা ২৮, সেখানে শুধু কালাই উপজেলাতেই এ সংখ্যা ২২ !

ইতিমধ্যে স‍্যোসাল মিডিয়ায় ‘করোনা কালাই’কে নিয়ে ট্রলও শুরু হয়েছে। কেউ বলছেন, ‘কালাইবাসী’ জয়পুরহাটকে ডুবাল, কেউ বলছেন, কালাইয়ের মানুষ অসচেতন, গোঁয়ার, আনাড়ি। তারা লাফাঙ্গা। ঢাকা থেকে করোনা এনে ঘরে ঘরে ছড়াচ্ছেন। গার্মেন্টস খুলে দেওয়ায় একজন আবার করোনা নিয়েই ছুটে গেছেন কাজে।

কালাইয়ে করোনার যে পরিস্থিতি তাতে কালাইবাসীর প্রতি ট্রল করা অস্বাভাবিক নয়। কারণ পার্শ্ববর্তী বগুড়া জেলার ১২ উপজেলা মিলে এখন পযর্ন্ত করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ১৭ । অথচ কালাইয়ের মতো ছোট্ট একটি উপজেলায় এ সংখ্যা এখন ২২!

এ পর্যন্ত যারা আক্রান্ত হয়েছেন দুয়েকজন ছাড়া সবাই শ্রমজীবী। জীবিকার জন্য ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর গিয়ে ফেরার সময় করোনা নিয়ে এসেছেন। সচেতনতার তো অভাব ছিলই। কিন্তু ভাবুন তো, এসব খেটে খাওয়া শ্রমজীবিরা যদি পেটের দায়ে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ না গিয়ে চোরাচালানী, মাদক ব‍্যবসায় জড়াতেন , চুরি ডাকাতি ছিনতাইয়ের মতো অপরাধী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়তেন কিংবা আলোচিত সেই পেশা কিডনি বিক্রি করতেন তাহলে কি খুশি হতেন!

করোনা আক্রান্ত রোগীকে ঘৃণা না করে সহানুভূতি দেখান। এটা অদৃশ্য শত্রু। সচেতন না হলে যে কোন সময়, যে কেউ আক্রান্ত হতে পারেন। এ শত্রুকে মোকাবেলা করার সবচেয়ে ভালো পন্থা হলো ঘরে থাকা।

বেশি বেশি করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হচ্ছে এ কারণে ভয়ে আতঙ্কে ভুগছেন তো? আসুন এবার জানার চেষ্টা করি কেন কালাইয়ে এতো বেশী করোনা রোগী শনাক্ত হচ্ছেন।

কালাইয়ে পাশ্ববর্তী বগুড়া জেলা। সেখানে এ পর্যন্ত করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন ১৭ জন। ২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী, বগুড়ার ১২ উপজেলার জনসংখ্যা প্রায় ৩৬ লাখ। গত একমাসে এখানে করোনা পরীক্ষা হয়েছে মাত্র ৬২৫ জনের। অর্থাৎ, এখন পর্যন্ত গড়ে এক লাখ মানুষের মধ্যে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১৭ জনের।

অন্যদিকে ২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী, কালাই উপজেলায় জনসংখ্যা মাত্র ১ লাখ ২৯ হাজার। এখন পযন্ত এখানে করোনা পরীক্ষা হয়েছে প্রায় ৫৫০ জনের। প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে করোনা পরীক্ষা হয়েছে ৪২০ জনের। এবার বুঝতে নিশ্চয়ই অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, বগুড়ার চেয়ে কেন কালাইয়ে বেশি করোনা শনাক্ত হচ্ছে।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা থেকে শুরু করে জাতিসংঘ সবাই বলে আসছে, টেষ্ট, টেষ্ট এবং টেষ্ট। কিন্তু, ল‍্যাব ও কিট সংকটে এখনো দেশে করোনা পরীক্ষার হার পর্যাপ্ত নয়।

শুধু কালাই নয়; জয়পুরহাটবাসীর সৌভাগ্য হুইপ ও সাংসদ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপনের মতো একজন জনবান্ধব নেতা পেয়েছেন। বগুড়ার মতো বড় একটি জেলায় যেখানে ল‍্যাব থাকার পরও একমাসে মাত্র ৬২৫ টি নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হয়েছে, সেখানে হুইপ তাঁর নিজ জেলায় এক মাসে দেড় হাজারেরও বেশি নমুনা পরীক্ষার উদ্যোগ নিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছেন। বাংলাদেশে আর কোন জেলা থেকে এক সঙ্গে তিনটি ল‍্যাবে নমুনা পরীক্ষার নজীর আছে কি না তা জানা নেই।
সাংসদ স্বপন এখানেই থেমে নেই, একটি মেডিকেল কলেজ প্রশাসনকে ২৪ ঘন্টা ল‍্যাব চালু রেখে তিন শিফটে করোনা পরীক্ষার প্রস্তাব দিয়েছেন। এতে মেডিক্যাল টেকনোলোজিষ্ট ও চিকিৎসকদের ওভার টাইম, প্রণোদনা এবং বাড়তি জনবল নিয়োগে যে ব‍্যয় হবে, সেই অর্থ প্রতিমাসে ব‍্যক্তিগত তহবিল থেকে সংকুলানের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।