মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি।

  1. মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি-৪৩

গত কয়েকটি পর্বে বেশ কজন মুসলিম ভূগোলবিদ, ইতিহাসবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানীকে নিয়ে কথা বলেছি। আজকের আসরে আমরা ক’জন মুসলিম কবি সাহিত্যিক এবং তাঁদের সৃষ্টিকর্ম নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো।

কবিতা সবসময়ই আরবদের কাছে খুবই জনপ্রিয় ছিল। ইসলাম বিস্তারের সূচনা থেকে আরবি সাহিত্য বিশেষ করে কবিতা নিয়ে আরো বেশি সৃষ্টিশীল প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে। ইসলাম আবির্ভাবের পর থেকে আরবরা তাদের বিভিন্ন উপলক্ষ্যকে কবিতার ভাষায় অর্থাৎ কাব্যরূপে তুলে ধরতো। ধীরে ধীরে বড়ো বড়ো কবি সাহিত্যিকের আবির্ভাব ঘটে এবং তাঁদের মাধ্যমে পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন বিষয় ও প্রসঙ্গ আরবি কবিতায় স্থান করে নেয়। বিখ্যাত কবি হাসসান বিন সাবিত অন্তত দশ বছর ধরে হযরত রাসূলে আকরাম (সা.) এবং তাঁর সাহাবিদের নিয়ে কবিতা লিখেছেন। নবীজীর জন্যে তিনি একটি কবিতা লিখেছিলেন যাতে কোরআনের শব্দমালা ব্যবহার করা হয়েছে। হাসসান এমন একজন কবি ছিলেন যিনি জাহেলিয়াতের যুগেও কবিতা লিখেছিলেন এবং ইসলামের আবির্ভাবের পরেও কবিতা লিখেছেন।

তিনি কবিতা লেখার মাধ্যমে রাসূলে খোদা (সা.) এবং মুসলমানদের সুরক্ষায় চেষ্টা চালাতেন আর ইসলাম ও মুসলমান বিরোধী কবিদের মোকাবেলা করতেন। ইরানের বিখ্যাত আলেমে দ্বীন আল্লামা আমিনি লিখেছেনঃ “সমস্ত আরববাসীই এ সত্য ও বাস্তবতা স্বীকার করে নিয়েছে যে শহরবাসী বা নাগরিক কবিদের মাঝে হাসসান বিন সাবিতই সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।” বলা হয়ে থাকে যে স্বয়ং রাসূলে খোদা (সা.) কাব হাসসান বিন সাবিত সম্পর্কে বলেছেনঃ ” হে হাসসান! যতোদিন তুমি আমাদের সমর্থনে তথা ইসলামের সুরক্ষায় কবিতা লিখবে রূহুল কুদস বা জিব্রাইল (আ.) র মাধ্যমে প্রত্যয়িত হবে।” বর্ণিত আছে যে, লক্ষাধিক লোকের সমাবেশে কবি হাসসান বিন সাবিত ইদে গাদিরকে নিয়ে কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। ঐ সমাবেশে বড়ো বড়ো অনেক বক্তা যেমন ছিলেন তেমনি ছিলেন সে সময়কার বিখ্যাত অনেক কবিও।

যাই হোক হাসসান বিন সাবিত যে কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলেন বাংলায় তার অনুবাদ দাঁড়াবে এ রকমঃ ” মহানবী (সা) গাদিরের দিনে মুসলমানদেরকে ডেকে বললেনঃ তোমাদের নবী এবং মাওলা কে? কোনোরকম দ্বিধা না করে সবাই সমস্বরে জবাব দিয়েছিলোঃ আল্লাহ হলেন আমাদের মাওলা আর আপনি আমাদের পয়গাম্বর, এ ক্ষেত্রে আমাদের মাঝে কোনোরকম নাফরমানি আপনি দেখবেন না। পয়গাম্বর আকরাম (সা) আলীকে বললেনঃ ওঠো! তুমিই আমার পরে এই জনগোষ্ঠির নেতা। আমি যার মাওলা,আলী তার মাওলা। তোমরা যথাযথভাবে তাকে অনুসরণ করো! হে খোদা! তার বন্ধুদেরকে তুমি ভালোবেসো এবং তার শত্রুদেরকে তোমার শত্রু জেনো!”

ইসলামী গদ্য সাহিত্যের ক্ষেত্রে কোরআনে কারিমের পরই হাদিসে নববী (সা) এর স্থান। কেননা হাদিসের গদ্য নিরলঙ্কার এবং প্রবহমান। প্রথম শতকের বক্তৃতাগুলো বিশেষ করে নবীজীর বিদায় হজ্জের ভাষণ থেকে শুরু করে হযরত আলী (আ) এর অলঙ্কারপূর্ণ বক্তৃতামালা ছিল মহৎ, সুরেলা ও ছন্দোময়। চিঠিপত্র, বিভিন্ন চুক্তিপত্র এবং অনুরূপ ধর্মীয় কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় সম্পন্ন অন্যান্য লেখালেখিও ছিল এই অলঙ্কারপূর্ণতার শামিল। এ সময় ধর্মীয় কবিতা, রাজনৈতিক কবিতারও বিস্তার ঘটেছিল ব্যাপকভাবে। এ সময়কার কবিতায় কোরআনের বিচিত্র শব্দমালা অর্থাৎ ইসলাম ও মুসলমানদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিচিত্র শব্দ দেদারসে ব্যবহার করা হয়েছিল। আবুল আসাদ দুয়ালি’র লেখা বহু পংক্তি প্রাথমিক পর্যায়ের দ্বীনী ও রাজনৈতিক কবিতা হিসেবে পরিগণিত। আমিরুল মোমেনিন (আ.) এবং ইমাম হোসাইন (আ.) এর শাহাদাতের পর দুয়ালির কবিতা হয়ে উঠেছিলো অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো। কবিতার বিষয়বস্তুও হয়ে ওঠে উত্তেজনাপূর্ণ। আলী (আ.) কে নিয়ে লেখা আবুল আসওয়াদ দুয়ালি’র কোনো কোনো কবিতা বা মর্সিয়া ছিল খুবই মর্মস্পর্শী ও হৃদয় বিদারক।

আদর্শিক দৃঢ়তা সম্পন্ন অপর এক মুসলমান কবি হলেন কুমাইত বিন যায়েদ আসাদি। কুমাইত কবি হিসেবেও ছিলেন খুবই মেধাবি। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন হিজরি ষাট সালে আর মৃত্যুবরণ করেছিলেন হিজরি ১২৬ সালে। তিনি ছিলেন কুফার অধিবাসী এবং সমকালীন কবিদের মাঝে শ্রেষ্ঠস্থানীয়। তিনি ছিলেন অনন্য এক কাব্যশৈলী ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। অন্তত পাঁচ হাজার পংক্তি তিনি রচনা করেছেন। তাঁর লেখা কাব্য সংকলন এখনো অবশিষ্ট রয়েছে। ৫৭৮ টি কসিদা নিয়ে সংকলিত তাঁর যে বইটি “হাশেমিয়াত” নামে বিখ্যাত, ঐ বইটি মূলত আহলে বাইতের পরিচয় সম্পর্কেই লেখা। কুমাইত ছিলেন খুবই জনপ্রিয় কবি বিশেষ করে আহলে বাইতের মহান ইমামগণের বিশেষ দোয়া ছিল তাঁর ওপর। তিনি ছিলেন আশুরা বিষয়ক মর্সিয়া রচনার ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠতম। ইমাম সাজ্জাদ (আ.) কবি কুমাইতকে সম্বোধন করে বলেছিলেনঃ “আমরা তোমার কাব্য ও শিল্পকর্মের মূল্য অর্থাৎ পুরস্কার দিতে পারবো না, আল্লাহ নিজেই তোমাকে পুরস্কৃত করুন।”

আবুল আলা মাআররি আব্বাসীয় শাসনামলের আরেকজন বিখ্যাত কবি। সিরিয়ার হালাবের দক্ষিণাঞ্চলীয় গ্রাম মাআররাতুন নুমানে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। কাব্যের শিল্পকলা সম্পর্কে বাবার কাছেই প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন তিনি। এরপর হালাবে যান এবং কাব্যচর্চার মধ্য দিয়ে সে সময়কার শ্রেষ্ঠ কবিতে পরিণত হন। হালাব থেকে মাআররায় ফিরে এসে আরবি কবিতা, প্রাচীন রীতিআচার, শর্শন ও ফিকাহ ইত্যাদি বিষয় চর্চায় জড়িয়ে পড়েন। তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র ও অনন্য প্রকৃতির কবি এবং দার্শনিক। হিজরি ৩৮৩ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।অপর এক বিখ্যাত কবি ছিলেন সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ হোসাইন মুসাভি বাগদাদি। তিনি অবশ্য শরিফ রাযি এবং সাইয়্যেদ রাযি নামেই বেশিরভাগ পরিচিত ছিলেন। পরহেজগার আলেম অর্থাৎ ধর্মীয় মনীষীদের খান্দানে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন খোদা প্রদত্ত মেধার অধিকারী। সেজন্যে সেই ছোটোবেলা থেকেই জ্ঞান-বিজ্ঞান, কাব্য-সাহিত্য ইত্যাদি সম্পর্কে খুব দ্রুতই ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন।

তাঁর সমকালীন কবি আব্দুল মালেক সাআলীবিও তাঁর কবিত্বের শ্রেষ্ঠত্বের কথা স্বীকার করে বক্তব্য রেখেছেন। সাইয়্যেদ রাযি তাঁর জীবিতাবস্থাতেই শুধু নয় বরং মৃত্যুর পরেও বিখ্যাত কবিদের কাতারে ছিলেন। ‘নাহজুল বালাগা’ তাঁরই সংকলিত অসাধারণ এবং কালজয়ী একটি শিল্পকর্ম। আলী (আ.) এর নসিহত, পত্রাবলি,বক্তৃতামালা ইত্যাদির সংকলন হচ্ছে নাহজুল বালাগা। আলী (আ.) এর অলঙ্কারপূর্ণ বক্তৃতার সবগুলো অবশ্য নাহজুল বালাগায় স্থান পায়নি। তবুও যেটুকুই স্থান পেয়েছে সেটুকুই যুগ যুগ ধরে বিশ্বমানবতাকে বিচিত্র যুগ সমস্যার সমাধানে দিক-নির্দেশনা ও পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে।